জীবননগর থেকে বিশেষ প্রতিনিধি:
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলা সাব রেজিষ্ট্রি অফিস দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। ওই অফিসের মহুরার আব্দুস সাত্তারের যোগসাজশে দলিল লেখক সিন্ডিকেটর সভাপতি হারু-অর-রশিদ ও সাধারণ সম্পাদক রায়হান উদ্দিন ভূমি ক্রেতাদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত মূল্য ছাড়াও বিভিন্ন ভুয়া খাত দেখিয়ে অবৈধভাবে প্রতি সপ্তায় লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। স্থানীয় সংসদ সদস্যের নামেও দলিল প্রতি ২৫০ টাকা হারে টাকা উঠানো হয়। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চলার পর গত ১২ এপ্রিল সংসদ সদস্য আলী আজগার টগর সাব-রেজিষ্ট্রি অফিস পরিদর্শন করে দুর্নীতির প্রমাণ পরওয়ার পর তা বন্ধের নির্দেশ দেন। কিন্তুসংসদ সদস্যের এ নির্দেশের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পুর্বের ন্যায় দুর্নীতি অব্যাহত রেখেছে সিন্ডিকেটটি।
জেলা রেজিষ্ট্রি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার পৌরসভা ব্যতিত ইউনিয়ন পর্যায়ের ১ লক্ষ টাকা মূল্যের একটি জমির দলিল রেজিষ্ট্রি করতে নিয়মানুযায়ী ৭ হাজার ২শ’ ৫০ টাকা খরচ হয়। এর মধ্যে স্ট্যাম্প খরচ ৩ হাজার টাকা, অফিস ফি ২ হাজার, জেলা উন্নয়ন কর ১ হাজার, ইউনিয়ন উন্নয়ন কর ১ হাজার টাকা, এন ফিস ১শ’ ৫০ টাকা এবং ই ফিস ১শ’ টাকা। কিন্তু তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, জীবননগর দলিল লেখক সিন্ডিকেটের সভাপতি ও সাধারন সম্পাদকের নির্দেশে দলিল লেখকরা ১ লাখ টাকা মূল্যের একটি দলিল রেজিষ্ট্রি করতে সরকার নির্ধরিত মূল্য ৭ হাজার টাকার স্থলে বিভিন্ন ভুয়া খাত দেখিয়ে ১২ হাজার টাকা থেকে ১৩ হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। যা সরকার নির্ধারিত মূল্যর থেকে কয়েক গুণ বেশী। হাতিয়ে নেওয়া অতিরিক্ত এ টাকার কোর রশিদ দেয়া হয় না। এ ছাড়াও কোন জমি ক্রেতা যদি বেলা ২ টার পর দলিল রেজিষ্ট্রি করতে আসেন তাহলে তার নিকট থেকে লেট ফি নামে ২০০ টাকা, দলিল রেজিষ্ট্রি করার সময় খারিজের ত্রুটি দেখিয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা এবং জমি ক্রেতাকে দলিল দেওয়ার সময় বিভিন্ন অজুহাতে আরো ৫০০ টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে দলিল রেজিষ্ট্রি করে বাড়ি ফেরার সময় কথা হয় উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামের মমিন হোসেনের সাথে। তিনি সম্প্রতি ডুমুরিয়া মৌজার সাড়ে ৮ শতক জমি ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় কিনেছেন। বৃহস্পতিবার দলিল লেখক আনিছুর রহমান তাঁর দলিলটি রেজিষ্ট্রি করে দিয়েছেন এবং রেজিষ্ট্রি খরচ বাবদ সাড়ে ১৫ হাজার টাকা নিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, একটি দলিল রেজিষ্ট্রি করতে সরকার নির্ধারিত ফি কত? তা সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসের নোটিস বোর্ডে টাঙিয়ে দেয়ার বিধান থাকলেও সেটা দেয়া হয়নি। ফলে না জানার কারণে জমি ক্রেতাদের কাছ থেকে দলিল লেখক সিন্ডিকেট অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। একই দিন উপজেলার মাধবপুর গ্রামের আতিয়ার রহমান মিনাজপুর মৌজার ৩ শতক জমি ৩৮ হাজার টাকা মূল্যে একটি দলিল রেজিষ্ট্রি করেছেন। দলিল লেখক তোফাজ্জেল রেজিষ্ট্রি খরচ বাবদ তাঁর কাছ থেকে নিয়েছেন সাড়ে ৪ হাজার টাকা। উপজেলার মৃগমারী গ্রামের আবু সায়েম মৃগমারী মৌজার সাড়ে ৩ শতক জমি ৬৩ হাজার টাকা মূল্যের একটি দলিল রেজিষ্ট্রি করেছেন। দলিল লেখক পিংক্কু তার কাছ থেকে রেজিষ্ট্রি খরচ বাবদ নিয়েছেন ৮ হাজার ২০০ টাকা।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার বিভিন্ন মৌজাভেদে প্রতি শতক জমির সরকার নির্ধারিত সর্বনিম্ন মূল্য ১০ হাজার ২০০ টাকা। এ ক্ষেত্রে প্রতিবিঘা (৩৩ শতক) জমির সর্বনিম্ন বিক্রয় মূল্য ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৬০০ টাকা হিসেবে একটি দলিল করতে সরকার নির্ধারিত ফি লাগে প্রায় ২৩ হাজার ৭৭০ টাকা। কিন্তু দলিল লেখক সিন্ডিকেট জমি ক্রেতাদের কাছ থেকে সর্বনিম্ন নেয় ৪০ হাজার টাকা। প্রতিটা দলিলে অতিরিক্ত নেয়া হচ্ছে ১৬ হাজার ৬০০ টাকা। সূত্র মতে, উপজেলায় প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৫০ টা করে দলিল রেজিষ্ট্রি হয়। সেক্ষেত্রে দলিল লেখক সিন্ডিকেট প্রতি সপ্তাহে ৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা, মাসে ৩৩ লাখ এবং বছরে প্রায় ৪ কোটি টাকা অতিরিক্ত হাতিয়ে নিচ্ছে।
এ ব্যাপারে উপজেলা চেয়ারম্যান গোলাম মোর্তূজা জানান, সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসের লাগামহীন দুর্নীতি বন্ধ হওয়া দরকার। দুর্নীতি বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি সাইদুর রহমান জানান, এ ব্যাপারে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের কাজ চলছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনে অভিযোগ দুদকে পাঠানো হবে। অভিযুক্ত মহুরার আব্দুস সাত্তার অভিযোগ অসস্বীকার করে বলেন, রেজিষ্ট্রি অফিসের দৃশ্যমান প্রতিটি স্থানে জমি রেজিষ্টির রেট চাট টাঙানো হচ্ছে। দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রায়হান উদ্দিন জানান, তারা সমিতির কার্যক্রম বন্ধ করে দেবেন।